একজন প্রাবন্ধিক, একজন শিক্ষক, একজন সংগঠক—তিন পরিচয়ে বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে যিনি রেখে গেছেন এক স্বতন্ত্র স্বাক্ষর
নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার চন্দ্রপাড়া গ্রাম থেকে উঠে আসা এক মানুষ কীভাবে বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনের অন্যতম প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে পারেন—যতীন সরকারের (১৯৩৬–২০২৫) জীবনী পড়লে সে প্রশ্নের উত্তর খানিকটা স্পষ্ট হয়। প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এই পুরোধা ব্যক্তিত্ব গত বছর আগস্টে প্রয়াত হয়েছেন, রেখে গেছেন প্রায় ছয় দশকের বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের এক সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার।
ভাঙনের কালে বেড়ে ওঠা
১৯৩৬ সালের ১৮ আগস্ট জন্ম নেওয়া যতীন সরকারের শৈশব-কৈশোর কেটেছে উপমহাদেশের এক অস্থির সময়ে—পঞ্চাশের মন্বন্তর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দেশভাগ-পূর্ব দাঙ্গা। এই ইতিহাসের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠাই সম্ভবত তাঁর পরবর্তী রচনায় গভীর সামাজিক-ঐতিহাসিক চেতনার বীজ বপন করে দেয়।
শিক্ষকতা থেকে শেকড়ে
জীবনের বড় অংশ তিনি কাটিয়েছেন ময়মনসিংহে, নাসিরাবাদ কলেজের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করে। চার দশকের বেশি সময় শিক্ষকতার পর ২০০২ সালে অবসরে গিয়ে স্ত্রী কানন সরকারকে নিয়ে ফিরে যান নিজের জেলা নেত্রকোনায়—শিকড়ের টানে।
যেখানে মিলেছে মার্কস আর রবীন্দ্রনাথ
যতীন সরকারের লেখার সবচেয়ে চেনা বৈশিষ্ট্য হলো ভিন্নধর্মী চিন্তাধারাকে একসূত্রে গাঁথার ক্ষমতা। তাঁর রচনায় পুরাণ আর দর্শন মিশে যায়; রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের মানবতাবাদী চেতনা মিলে যায় মার্কসবাদী বিশ্লেষণের সঙ্গে, আর তার সবটাই বাঁধা থাকে বাংলার লৌকিক জীবনবোধে। ১৯৬৭ সালে একটি রচনার মাধ্যমে তিনি প্রথম বাঙালি বিদ্বৎসমাজের নজর কাড়েন—যা তাঁর দীর্ঘ প্রাবন্ধিক জীবনের সূচনাবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হয়। এই কারণেই তাঁকে অভিহিত করা হয় “সাঁকো বাঁধার নিপুণ কারিগর” নামে—একাডেমিক জ্ঞান আর জনমানুষের সংস্কৃতিবোধের মধ্যে সেতু তৈরির কারিগর।
কলমের বাইরেও এক যোদ্ধা
লেখালেখির পাশাপাশি যতীন সরকার সক্রিয় ছিলেন বামপন্থী রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক সংগঠনে। দুই মেয়াদে তিনি দায়িত্ব পালন করেন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি হিসেবে। তাঁর কাছে সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা কখনোই রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিমূর্ত কাজ ছিল না—বরং তা ছিল সমাজ বদলের সংগ্রামেরই অংশ।
কেন তিনি গুরুত্বপূর্ন্য
বিশ্লেষকদের মতে, যতীন সরকারের গুরুত্ব মূলত তিনটি জায়গায়। প্রথমত, ভিন্ন আদর্শিক উৎস—মানবতাবাদ, মার্কসবাদ, লোকসংস্কৃতি—কে একসঙ্গে মেলানোর যে প্রয়াস তিনি করেছেন, তা স্বতন্ত্র। দ্বিতীয়ত, তত্ত্ব ও বাস্তব সংগঠনের কাজকে তিনি সমান্তরালভাবে চালিয়ে গেছেন, প্রমাণ করেছেন বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা সমাজ-বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না। তৃতীয়ত, ঢাকাকেন্দ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক বলয়ের বাইরে থেকেও—ময়মনসিংহ-নেত্রকোনা অঞ্চলে থেকেই—তিনি জাতীয় পরিসরে প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পেরেছিলেন।
শেষ অধ্যায়
দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত জটিলতা ও কিডনি সমস্যায় ভুগে ২০২৫ সালের ১৩ আগস্ট ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৮৯ বছর বয়সে যতীন সরকার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশের প্রগতিশীল বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তৈরি হয় এক অপূরণীয় শূন্যতা।
তবু তাঁর রচনা আর কর্মকাণ্ড থেকে যায়—তত্ত্ব ও লৌকিকতার, রাজনীতি ও সাহিত্যের সেই বিরল সংশ্লেষণের সাক্ষী হয়ে।
